ধরে নিচ্ছি, সাম্প্রতিক সময়ে আপনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এবং আপনি ভাগ্যবানদের একজন। করোনা ভাইরাসের হাত থেকে থেকে বেঁচে ফিরেছেন। কিন্তু কোভিড-১৯ টেস্টে নেগেটিভ আসা মানেই সব বিপদ কেটে যাওয়া নয়। একটি মারাত্নক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে আপনার শরীরের ভেতর। এই যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেহকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন বিশেষ যত্নের।
কোভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠার পর, অধিকাংশ মানুষের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরী হয়ে যায়। এই অ্যান্টিবডির গুণে আপনি একইরকম করোনা ভাইরাস দিয়ে হয়তো আর আক্রান্ত হবেন না। তবে এই ইমিউনিটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। এমনকি টিকা নিয়ে যাদের শরীরে অ্যান্টিবডি গঠন হয়েছে, তারাও তো আক্রান্ত হচ্ছেন। এসবের মূলে কারণ, করোনা ভাইরাসটি অসম্ভব রকমের পরিবর্তনপ্রবণ। প্রতিবারই নতুন ও আগ্রাসী রূপে সে হাজির হয়। সুতরাং, করোনা ভাইরাস সম্পর্কিত আর সব বিষয়ের মত, এই সেরে ওঠা আর আবারও আক্রান্ত না হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না।
করোনা মোকাবেলায় রেমডেসিভির কতটা কার্যকরী - জানতে পড়ুন
![]() |
এতদসত্ত্বেও, কোভিড-১৯ নেগেটিভ হওয়ার পরবর্তী সময়টাতে কিছু নির্দিষ্ট নিয়মকানুন মেনে চললে, আপনি শরীরকে দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারবেন। এই লেখায় সেই সমন্ধে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছি আমরা।
শ্বাসকষ্টের রোগ অ্যাজমা : রোগের পরিচিতি
কোভিড পরবর্তী লাইফস্টাইল : করোনা ভাইরাস থেকে সেরে ওঠার সময় এই কাজগুলি করুন
১। নিয়মিত ব্যায়াম করুন :
কোভিড-১৯ পরবর্তীতে আপনার শরীর দুর্বল থাকবে। বেশ কয়েকদিন শয্যাশায়ী থাকার ফলে চট করে বেশী পরিশ্রম করা সম্ভব হবে না। তারপরও, যতটুকু সম্ভব হয় ব্যায়াম আপনাকে করতেই হবে।
প্রথম ক’দিন অল্প একটু হাঁটাচলা করুন ঘরের ভেতরেই। তারপর ধীরে ধীরে ফ্রি-হ্যান্ড বিভিন্ন এক্সারসাইজ স্বল্প পরিমাণে শুরু করুন। বড় মাসেল গ্রুপ যেমন : পা পিঠ ও কাঁধ দিয়ে শুরু করুন। অতিরিক্ত কিছুই করতে হবে না। কিন্তু কিছু না কিছু করতে হবে। ফুসফুস ও রক্ত সংবহন ব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যায়াম খুবই জরুরী। তাছাড়াও দীর্ঘ দিন ইনফেকশান, জ্বর, কড়া ঔষধ চললে শরীরের প্রচুর পেশী ক্ষয় হয়। এজন্য ব্যায়াম ও সুষম খাবার খাওয়ার বিকল্প নেই।
এবং যা-ই করবেন সেটি প্রতিদিন করবেন। করোনা বিধ্বস্ত শরীরকে সারিয়ে তোলার জন্য এক্সারসাইজের কোন বিকল্প নেই। ক’দিন ব্যায়াম করলেই দেখবেন, মানসিক ও শারীরিক দুই প্রকারেই আপনি অনেক বেশী সতেজ ও সুস্থ বোধ করছেন। করোনা ভাইরাস থেকে সেরে ওঠার কাজটিও দ্রুত করতে পারবেন।
অ্যাজিথ্রোমাইসিন, মক্সিফ্লক্সাসিন অ্যান্টিবায়োটিক পরবর্তী জটিলতাগুলো জেনে রাখুন
২। প্রোটিন খান :
প্রোটিন আমাদের শরীরের গাঠনিক একক। কোভিড-১৯ থেকে সেরে উঠতে প্রোটিন আপনাকে খুবই সাহায্য করবে। খাদ্যের প্রোটিনগুলো আমাদের শরীরের অতি জরুরী অ্যামিনো এসিড। এই অ্যামিনো এসিডগুলো বহু ক্ষতিকর রোগজীবাণু থেকে মানুষকে রক্ষা করে। ক্ষয়প্রাপ্ত শরীরে পেশীকে গঠনের জন্য প্রোটিন অপরিহার্য।
কোভিড-১৯ থেকে সেরে উঠছেন, এমন একজন রোগীর হাই প্রোটিন ডায়েট প্রয়োজন। দিনে ৭৫-১০০ গ্রাম প্রোটিন থাকতে হবে আমাদের খাবারে। যারা ছয় ফিট বা তার বেশী লম্বা, তাদের আরও বেশী প্রয়োজন হবে। ডাল, মটর, ছোলা খাওয়ার চেষ্টা করুন। যদি আপনার পেটে সহ্য হয়, তাহলে দুধ ও দুধ থেকে তৈরী বিভিন্ন খাবারও খেতে পারেন। তবে ফার্স্ট থেকে থার্ড জেনারেশানের সেফালোস্পোরিন অ্যান্টিবায়োটিক যদি সাম্প্রতিক করোআয় ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে পেটের অনেক ভাল ব্যাকটেরিয়া এখন মৃত। ভাল ব্যাক্টেরিয়ার অনুপস্থিতিতে, রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাক্টেরিয়া পেটের ভেতরের পরিবেশের দখল নয়। সুতরাং,দুধ ফুটিয়ে খাওয়া উচিত।
সয়া, বাদাম, বীজ জাতীয় খাবার রাখুন প্রতিদিনের তালিকায়। প্রাণিজ আমিষে যাদের অরুচি নেই, তারা মুরগীর মাংস, মাছ , ডিম খেতে পারেন।
অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার টীকায় কি রক্ত জমাট বেঁধে যায়?
৩। ফল এবং শাকসবজি খান :
কোভিড-১৯ পরবর্তী চিকিৎসায় ফলমূল শাকসবজির ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শাক সবজিতে প্রচুর পরিমাণে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান রয়েছে। ডায়েটারি ফাইবার, ভিটামিন, জরুরী খনিজ উপাদান এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উৎস শাকসবজি এবং ফলমূল। এই পুষ্টি উপাদানগুলো একটি শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। বিভিন্ন সংক্রমণের বিরুদ্ধে আমাদের শরীরকে সুরক্ষা দেয়।
প্রতিদিন ২ কাপ তাজা ফল এবং ২.৫ কাপ সবজি খান। কমলা, কিউয়ি, স্ট্রবেরী, পেয়ারা, পেঁপের মত ফলগুলো ভিটামিন সি-তে পূর্ণ। প্রতিদিনের খাবারে এসব ফল, আপনার শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরীতে সহায়তা করবে, এবং কোভিড-১৯ এর পরে স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াটিকে আরও দ্রুততর করবে। সমস্ত সবুজ শাক সবজি, গাজর এবং লাউ কুমড়ো আপনার ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে তোলে।
ইমিউন সিস্টেম কি ? ইমিউনোলজি জানুন
৪। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টিকারী বিভিন্ন খাবার :
কোভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠার সময় বিভিন্ন ফলমূল শাকসবজি তো খাবেনই, সাথে ইমিউনিটিকে বর্ধনকারী বিভিন্ন মসলা ও ভেষজ উপাদানকে রাখতে পারেন আপনার খাদ্য তালিকায়। এসব মসলায় বিভিন্ন ধরণের অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের প্রাচুর্য থাকে। সেই সাথে শরীরে ক্রিয়াক্ষম বিভিন্ন যৌগিক পদার্থ। এই খাদ্য উপাদানগুলো আপনার নিয়মিত খাদ্যতালিকা থাকা দরকার। তাছাড়া বিভিন্ন ভেষজ পানীয় যেমন - হলুদ দিয়ে দুধ, আদা চা, গ্রিন টি ও অন্যান্য হার্বাল-চা খেয়ে আপনার এনার্জি লেভেল বাড়াতে পারেন। এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করতে পারেন।
শরীরের অতীব জরুরী পাঁচটি খনিজ উপাদান
৫। পর্যাপ্ত পানি ও তরল পান করুন :
পানি জীবনের অপরিহার্য উপাদান। রক্তে বিভিন্ন পুষ্টি পরিবহনে প্রধান ভূমিকা রাখে পানি। পানি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। বিপাকীয় বর্জ্য পদার্থকে শরীর থেকে নিষ্কাশনও করা হয় পানির সাহায্যেই। সুতরাং, কোভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠার সময় পর্যাপ্ত এবং নিয়মিত ভাবে পানি পান খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
করোনা ভাইরাস থেকে যে রোগী সেরে উঠছেন তাকে প্রতিদিন কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি নিয়মিত বিরতিতে পান করতে হবে। দীর্ঘ দিন কোন সংক্রমণে ভুগলে, শরীরে পানিশূন্যতার সৃষ্টি হয়।
সুতরাং, যখন আপনি সেরে উঠছেন, পানির পরিমাণ শরীরে ঠিক রাখা অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন রসালো খাবার, স্যুপ আর হার্বাল টিও পান করতে পারেন। খুব বেশী কফি, কড়া লিকারের দুধ চা খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। এগুলোতে ক্যাফিন থাকে। কৃত্রিম ফ্রুট জুস, সিরাপ, কার্বনেটেড কোমল পানীয় বর্জন করুন কোভিড থেকে সেরে ওঠার সময়টায়।
৬। তেল ও চর্বি :
করোনা ভাইরাস সংক্রমণ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার পর বিভিন্ন আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড গ্রহণ করা প্রয়োজন। যেমন বাদাম, ওলিভ, সানফ্লাওয়ার, সয়, ক্যানোলা এবং কর্ণ অয়েল। বিভিন্ন স্যাচুরেটেড ফ্যাট যেমন চর্বিবহুল মাংস, ক্রিম, চীজ, ঘি বর্জন করুন। এর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাতকৃত খাবার, ফাস্ট ফুড, কড়া ভাজাভুজি, কুকি, কেক এসব খাবার, খাবেন না। এগুলোতে ট্রান্স ফ্যাট থাকে।
৭। লবণ ও চিনি কম খান :
দিনে লবণ পাঁচ গ্রামের কম খান। লবণ হিসেবে আয়োডাইজড লবণ ব্যবহার করতে হবে। সাম্প্রতিক কালে করোনা নেগেটিভ হয়েছেন এমন কারও জন্য রান্না করার সময় কম লবণ দিন তরকারিতে। যেসব চিপস, প্যাকেটজাতঃ স্ন্যাক্স জাতীয় খাবারে উচ্চ মাত্রায় সোডিয়াম থাকে সেগুলি বর্জন করুন।
একই কথা চিনির বেলায় প্রযোজ্য। কোভিড থেকে সেরে উঠছেন, এমন রোগী চিনি কম খাবেন। কুকি। কেক, চকলেট এসব বর্জন করে ফল আর বাদাম খান।
৮। মস্তিষ্ককে শাণ দিন :
করোনা ভাইরাসের দীর্ঘ সংক্রমণে মস্তিষ্কের কোষের ক্ষতি হয়। মনযোগ দেয়ার ক্ষমতা, অবধারণ ক্ষমতা, এবং স্মৃতির ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জন্য প্রতিদিন কিছু সময় সুডকো, দাবা সহ বিভিন্ন মেমোরি গেম খেলার চেষ্টা করা যেতে পারে। পনের মিনিট কোন বই পড়ুন। অল্প লেখালেখি করুন। মস্তিষ্ককে ব্যবহার করতে হয় এধরণের কাজকর্ম প্রতিদিনই কিছু করতে পারলেন ভালো। এখানেও ব্যাপারটা ব্যায়ামের মতই।
৯। কিছু দিন বিশ্রাম করুন :
কোভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠার পর সাথে সাথে আগের কর্মব্যস্ততায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। যারা কোভিড-১৯এ আক্রান্ত হয়ে, হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট থেকে বাড়িতে ফিরছেন, তারা কোভিড টেস্টে নেগেটিভ আসার পর থেকে শুরু করে কমপক্ষে এক মাস বিশ্রাম নিন। এই সময়টা ব্যায়াম, হাঁটাচলা, স্বাভাবিক কাজকর্মগুলো, সময়মত ঘুম থেকে ওঠা, ঘুমাতে যাওয়া, অল্প পড়ালেখা, ঠিক মত সময় ধরে খাওয়া দাওয়া এই চর্চাগুলো করতে থাকুন। মনে রাখবেন, সাম্প্রতিককালে আপনি একটি কঠিন রোগ থেকে সেরে উঠেছেন। পুরনো প্রাত্যাহিক চর্চায় ধীরে ধীরে ফিরে যাওয়াই সমীচিন। এখনও শরীরের ভেতরে সমস্ত মেজর অর্গান কি অবস্থায় আছে আপনি জানেন না।
১০। উৎকন্ঠিত হওয়ার মত কোন উপসর্গ থাকলে সতর্ক হোন :
শরীরের প্রবল ম্যাজ ম্যাজ ভাব, বা সারাক্ষণ মাথা ধরে থাকা, শ্বাসের স্বল্পতা, বুকে টাইট ভাব হওয়া - এরকম বিভিন্ন ধরণের উপসর্গগুলো বিষয়ে খেয়াল রাখুন। ডাক্তারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগে থাকুন। আপনার বাসায় কোভিড-১৯ থেকে যে রোগীটি সেরে উঠছেন, তিনি এরকম কোন অভিযোগ করছেন কিনা,লক্ষ্য রাখ।
দীর্ঘ জীবন পাওয়ার জন্য এই ৯টি নিময় মেনে চলুন
সাধারণতঃ, কোভিড-১৯ থেকে সেরে উঠছেন এমন একজন রোগীর তিন সপ্তাহ প্রয়োজন হয় পুরোপুরি সুস্থ হতে। অনেক গবেষণাতেই লক্ষ্য় করা গেছে যে, করোনা নেগেটিভ হওয়ার ও সেরে ওঠার পর রোগীদের কিডনি, ফুসফুস, হার্টে সম্পর্কিত বিভিন্ন উপসর্গ প্রকাশ পায়। কোভিড-১৯ পরবর্তী অন্য জটিলতার মধ্যে রয়েছে স্নায়ুতন্ত্রের বৈকল্য। করোনা ভাইরাস মস্তিষ্কের কোষ এবং নার্ভাস সিস্টেমকে আক্রমন করতে পারে। যদিও এটি আপাততঃ পর্যবেক্ষণ লব্ধ তথ্য। এই বিষয়ে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রতিষ্টিত করা যায়নি। এবং বলা বাহুল্য, প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রেই এমন ঘটনা ঘটছে না। আগে থেকেই শরীরে এই অর্গানগুলোতে সমস্যা থাকলে, তাদেরই বিপদের ঝুঁকি বেশী। সুতরাং, করোনা পরবর্তী সময়টা নিজের দিকে খেয়াল রাখুন। আপনার পরিবারের বা প্রতিবেশী হয়তো আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাদের দিকে মনযোগী হোন। আর, করোনা পরবর্তী স্বাস্থ্যকে পুনরুদ্ধার করতে যদি চান - তো, কোভিড-১৯ নেগেটিভ হওয়ার পরবর্তী এই পরামর্শগুলো মেনে চলতে পারেন।
আরও পড়ুন : করোনা আক্রান্ত ফুসফুসের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার : ফুসফুসের খাবার ও ব্যায়াম


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন