এ্যাজমা একটি ক্রনিক রোগ। তবে উপযুক্ত চিকিৎসা কাজ করে বটে। অধিকাংশ অ্যাজমা রোগীই সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সুস্থ জীবন যাপন করতে পারেন। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য রোগের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। তবে পরিস্থিতি এবং রোগী অনুযায়ী এই লক্ষ্যের পরিবর্তন হতে পারে। এখানে একটি দুর্ভাগ্যজনক বিষয় পর্যবেক্ষণ করা যায়। বেশীর ভাগ সমীক্ষাতেই দেখা গেছে যে, রোগীরা বলছেন চিকিৎসা সত্ত্বেও রোগের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তারা সন্তুষ্ট নন। বাস্তবতার সাথে রোগী ও চিকিৎসক উভয়ের প্রত্যাশার পার্থক্যই হয়তো প্রতিফলিত হয় সমীক্ষার এহেন ফলাফলে।
রোগীকে সবসময়ই নিজেদের রোগ বিষয়ে দ্বায়িত্বশীল হতে উৎসাহ দিতে হবে। অ্যাজমা কি বিষয় , সেটি যথাসম্ভব স্পষ্ট করে তাদের বোঝানো দরকার। বিভিন্ন উপসর্গগুলো এবং শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহের মাঝে সম্পর্কটি তাদের জানা থাকলে সুবিধে। এই রোগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গগুলি খেয়াল করতে হয়। যেমন, শ্বাস প্রশ্বাসের অস্বস্তির দরুণ রাতের বেলা ঘুম ভেঙে যাচ্ছে কি না। রোগী যে ওষুধ গ্রহণ করেন, সেগুলি সমন্ধে তাঁর নিজের একটি নূন্যতম পরিমাণে হলেও ধারণা থাকা প্রয়োজন। যারা পারবেন, তাদের জন্য নিয়মিত “ পিক ফ্লো” পরিমাপ করারও পরামর্শও দেয়া যেতে পারে। অ্যাজমা রোগী তার নিজের রোগ কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন, চিকিৎসক সেটি কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করে জেনে নিবেন। রোগী তার সুবিধার জন্য রোগ-নিয়ন্ত্রণের সমস্ত নিয়মগুলো ডাক্তারের কাছ থেকে লিখিত আকারেও নেয়ার জন্য আবেদন করতে পারেন।
যে সব কারণে রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পায় সেগুলি এড়িয়ে চলা
পেশাগত কারণে (রাসায়নিক, কৃষি কারখানার শ্রমিকগণ) যাদের অ্যাজমা হয়ে যায় তাদের ক্ষেত্রে রোগের উপসর্গ বৃদ্ধিকারী কারণগুলোকে এড়িয়ে চলা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তবে এলার্জিক বা জন্মগত ভাবেই এ্যাজমা আছে এমন রোগীরাও এই নিয়ম মেনে চললে উপকার পেতে পারেন। যেসব জিনিস দিয়ে রোগীর এলার্জি হয় সেগুলি থেকে দূরে থাকতে হবে। অনেকের ঘরের কার্পেট, তোষক ইত্যাদিতে ‘ডাস্ট-মাইট’ থাকে। এই অতিক্ষুদ্র কীট বিশ্বজুড়ে বহু মানুষকে এলার্জিতে ভোগায়। বায়ুবাহিত কণায় যাদের এলার্জি হয় তাদের জন্য আত্নরক্ষণ দুষ্কর। কারণ বাতাসের অতিসূক্ষ এসব কণা থেকে বেঁচে থাকা সবসময় সম্ভব হয় না। ফাংগাসের সংক্রমণ যেন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। যেসব ঔষধ সেবনে উপসর্গ বৃদ্ধি পায় সেগুলির বিকল্প খুঁজতে হবে। সবচেয়ে জরুরী বিষয়, ধূমপায়ীদের ধূমপান ত্যাগ কারণ ধূমপানে শুধু যে শ্বাসতন্ত্রের সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পায় না, গ্লুকোকর্টিকয়েড থেরাপীও ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে ঠিকমত কাজ করে না।
মস্তিষ্কে কারেন্টের ছোটাছুটি। মানুষ কি এতটুকুই? জানুন নিউরোলজি, স্নায়ুতন্ত্রের বিন্যাস
অ্যাজমা চিকিৎসার পর্যায়ক্রমিক পাঁচটি ধাপ
প্রথম ধাপ : ইনহেলার রূপে শর্ট-এক্টিং বিটা-টু এড্রেনোসেপ্টার এগনিস্ট ব্রঙ্কোডাইলেটর ব্যবহার
l বিভিন্ন প্রকার ইনহেলারের ব্যবহার হয় অ্যাজমার চিকিৎসায়। যন্ত্র বেছে নেয়া হয় রোগীর স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী। তবে মিটার্ড-ডোজ ইনহেলারের ব্যবহার সবচেয়ে প্রচলিত।
l যাদের মাইল্ড-ইন্টারমিটেন্ট অ্যাজমা ( তিন মাস যাবত উপসর্গ সপ্তাহে একবারের কম প্রকাশ পেলে। রাতের বেলা হাঁপানি বাড়াবাড়ি রকমের বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনা দু’বারের কম হলে), তাদের ক্ষেত্রে একটি শর্ট-এক্টিং বিটা-টু এগনিস্ট ইনহেলার ব্যবহারই যথেষ্ট হয়।
![]() |
l এরকম ঔষধের মধ্যে রয়েছে - সালবিউটামোল অথবা টারবিউট্যালিন। রোগী তার প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাবহার করেন। তবে সাধারণতঃ সকাল ও রাতে এক চাপ করে নেয়া হয়।
l তবে অনেকসময়ই রোগী এবং চিকিৎসক উভয়ই অ্যাজমা কতটুকু গুরুতর সেটি নির্ণয়ে ব্যার্থ হন। এক্ষেত্রে উপসর্গগুলো প্রকটরূপ ধারণ করতে পারে। তখন চিকিৎসার দ্বীতিয় ধাপে যেতে হয়।
দ্বীতিয় ধাপ : এ্যাজমা প্রতিরোধমূলক নিয়মিত চিকিৎসা শুরু করা (রেগুলার প্রিভেন্টার থেরাপী)
l নিয়মিত এন্টি-ইনফ্লামেটরী শুরু করতে হবে। সাথে বিটা-টু এগনিস্টও আগের মত চলবে।
l প্রদাহ উপশমকারী নতুন এই ওষুধগুলো হচ্ছে ইনহেলড গ্লুকোকর্টিকয়েডস, যেমন - বিক্লোমেটাসোন, বিউডোসোনাইড, ফ্লুটিকাসোন, মোমেটাসোন অথবা সাইক্লেসোনাইড।
![]() |
| বিক্লোমেটাসোনের রাসায়নিক গঠন |
l এই চিকিৎসা পাবে যেসব রোগীর বিগত দুই বছর ধরে অ্যাজমার উপসর্গগুলো প্রকট রূপ ধারণ করে
l যারা সপ্তাহে তিনবার বিটা-টু এগনিস্ট ব্যবহার করছেন অথবা আরও বেশী। কিন্তু উপকার পাচ্ছে না
l যাদের ক্ষেত্রে, সপ্তাহে তিনবার বা আরও বেশীবার উপসর্গ তীব্র আকার নেয়।
l যারা প্রতি সপ্তাহে একবার রাতে ঘুমের মধ্যে হাঁপানির আক্রমণের স্বীকার হয়েছেন। শ্বাসকষ্টের কারণে রোগী জেগে উঠতে বাধ্য হন।
l প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য ৪০০ মাইক্রোগ্রাম বিক্লোমেটাসোন ডাইপ্রোপায়োনেট দিয়ে চিকিৎসা শুরু করা যায়। যদিও ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে আরও বেশী ডোজের প্রয়োজন পড়বে।
l স্টেরয়েড ব্যবহার করতে না চাইলে বিকল্প রয়েছে। যেমন - ক্রোমোন্স, লিউকোট্রিন রিসেপ্টর এন্টাগনিস্ট, থিওফাইলিন। তবে এসব তেমন কাজ করে না।
তৃতীয় ধাপ : সংযোজিত চিকিৎসা (এ্যাড-অন থেরাপী)
l নিয়মিত ইনহেলড গ্লুকোকর্টিকয়েড ব্যাবহারের পরেও যদি একজন রোগীর অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণে না আসে, সেক্ষেত্রে জানা দরকার চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো আদৌ ঠিকমত অনুসরণ করা হচ্ছে কি না।
l জানতে হবে রোগী ঠিকমত ইনহেলার ব্যবহার করেন কিনা, এলার্জি সৃষ্টিকারী বস্তু থেকে দূরে থাকছেন কি না, ধূমপান করছেন কি না বা ধূমপায়ী কারও সাথে মিশেন কিনা।
l ইনহেলড গ্লুকোকর্টিকয়েডের ডোজ বৃদ্ধি করলে অনেক রোগী উপকার পান। তবে যারা ইতিমধ্যেই প্রতিদিন ৮০০ মাইক্রোগ্রাম বিক্লামেটাসোন ডাইপ্রোপায়োনেট বা সমমানের স্টেরয়েড ব্যবহার করছেন, তাদের নতুন চিকিৎসা যোগ করতে হবে।
l একটি ইনহেলড গ্লুকোকর্টিকয়েডের সাথে লং-এক্টিং বিটা-টু এগনিস্ট যোগ করে দিলে অ্যাজমার নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হয়। শুধুমাত্র গ্লুকোকর্টিকয়েড বৃদ্ধি করার মাধ্যমে যেটি সম্ভব হয় না।
l গ্লুকোকর্টিকয়েড এবং লং-এক্টিং বিটা টু এগনিস্টের কম্বিনেশান ইনহেলার পাওয়া যায় এখন। এগুলির ব্যবহার অধিক সুবিধাজনক। রোগীর জন্য যেমন সহজ হয়, তেমনি লং-এক্টিং-বিটা-টু-এগনিস্টের একচেটিয়া ভাবে গ্রহণ করা থেকেও রোগী বেঁচে যান।
l শুধুমাত্র লং-এক্টিং ব্যবহার করলে অ্যাজমা অতি-মারাত্নক আকস্মিক আক্রমণের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। হাঁপানির প্রাবল্যে রোগী মারাও যেতে পারেন।
l ফোর্মোটেরোলের (লং-এক্টিং বিটাটু) ক্রিয়া সালবিউটামোলের মতই তাৎক্ষণিক। যেকারণে, বাছাইকৃত রোগীদের ক্ষেত্রে বিউডোসোনাইড এবং ফোর্মোটেরোলের একত্র ব্যাবহার আকস্মিক হাঁপানিতে প্রাণরক্ষা যেমন করতে পারে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা পদ্ধতিও হতে পারে এটি।
l লং-এক্টিংদের বিকল্প হিসেবে ওরাল-লিউকোট্রিন রিসেপ্টর এন্টাগনিস্ট , যেমন মন্টিলুকাস্ট ১০ মিগ্রা ব্যবহার করা যেতে পারে প্রতিদিন। এটি লং-এক্টিঙের তুলনায় কম কার্যকরী। তবে ইনহেলড গ্লুকোকর্টিকয়েডের মাত্রা হ্রাসকরণ এবং উপসর্গের তীব্রতা নিয়ন্ত্রণের জন্য মন্টিলুকাস্ট ব্যবহার করা যেতে পারে।
চতুর্থ ধাপ : ইনহেলড গ্লুকোকর্টিয়েড ও সংযুক্ত-থেরাপীর পরও নিয়ন্ত্রণে না আসলে - চতুর্থ ড্রাগ যোগ করতে হবে
l প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে, ইনহেলড গ্লুকোকর্টিকয়েডের মাত্রা ২০০০ মাইক্রোগ্রাম বিক্লোমেটাসোন ডাইপ্রোপায়োনেট বা বিউডেসোনাইড পর্যন্ত বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
l যাদের ক্ষেত্রে আপার-এয়াওয়ে ( নাসিকা ও সংলগ্ন এলাকা) উপসর্গগুলো প্রধানরূপে দেখা দেয়, তাদের ক্ষেত্রে একটি ন্যাসাল গ্লুকোকর্টিয়েড প্রিপারেশান ব্যবহার করা উচিৎ।
l লিউকোট্রিন রিসেপ্টর এন্টাগনিস্ট, লং-এক্টিং এন্টিমাসকারিনিক এজেন্ট, থিওফাইলিন বা স্লো-রিলিজ বিটা এগনিস্ট ব্যাবহারের কথা ভাবা যেতে পারে।
l নতুন সংযোজন কাজ না করলে সেটি বন্ধ করে দেয়া হয়।
পঞ্চম ধাপ : ওরাল-গ্লুকোকর্টিকয়েডের নিয়মিত ব্যবহার
l এই পর্যায়ে, প্রেডনিসলোন থেরাপী ( সকালে একটি মাত্র ডোজ হিসেবে দেয়া হয়) শুরু করতে হবে। যে নূন্যতম পরিমাণ প্রেডনিসলোন ব্যবহার করে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, তার বেশী ব্যবহার করা যাবে না।
l যারা দীর্ঘ মেয়াদে গ্লুকোকর্টিকয়েড ট্যাবলেট নিচ্ছেন (তিন মাসের অধিক) বা বছরে গ্লুকোকর্টিকয়েডের তিন বা চারটা কোর্স পেয়ে থাকেন তাদের ক্ষেত্রে নানান পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি থাকে। যাদের ক্ষেত্রে হাড়ক্ষয় বা অস্টিওপোরোসিসের সম্ভাবনা রয়েছে তাদের ঝুঁকি প্রশমনের জন্য বিসফসফোনেট দেয়া হয়।
l পঞ্চম ধাপের চিকিৎসার পরও যাদের হাঁপানি কমে না, উপসর্গে ভুগতে থাকেন, ফুসফুসের কার্যক্ষমতার কোন উন্নতি হয় না তাদের ক্ষেত্রে “ ওম্যালিযুম্যাব ” যোগ করে দেয়া যায়।
l “ ওম্যালিযুম্যাব ” একটি মনোক্লোনাল এন্টিবডি। এটি ইমিউনোগ্লোবিউলিন-ই’র বিরুদ্ধে কাজ করে। যাদের ক্ষেত্রে অ্যাজমার কারণ অতিরিক্ত দেহের অতিরিক্ত পরিমাণ ইমিউনোগ্লোবিউলিন সৃষ্টি তাদের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা হয়।
l যাদের ক্ষেত্রে ইয়োসিনোফিল ঘটিত কারণে অ্যাজমা হয়, তাদের জন্য ব্যবহার করা হয় “ মেপোলিযুমাব”। এটিও একটি মনোক্লোনাল এন্টিবডি। এটি ইন্টারলিউকিন-৫ কে ইয়োসিনোফিলের ওপরস্থ রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত হতে বাঁধা দেয়।
l রোগপ্রতিরোধ ব্যাবস্থাকে দমনকারী চিকিৎসা যেমন - মিথোট্রিক্সেট, সাইক্লোস্পোরিন বা ওরাল-গোল্ড আজকাল আর তেমন ব্যবহার করা হয় না। কারণ এসব চিকিৎসার উপকার সীমিত, আবার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অধিক।
অ্যাজমা রোগের কারণ , লক্ষণ, রোগ নির্ণয়
-------------------------------------------------------------------------------





কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন